সমাস কাকে বলে?
বাক্যের মধ্যে পরস্পর সম্পর্কিত একাধিক পদের এক শব্দে পরিণত হওয়ার নাম সমাস। এটি একটি সংযোজন প্রক্রিয়া। সমাসের প্রধান কাজ হচ্ছে সংক্ষিপ্তকরন। নতুন শব্দ গঠনের জন্য সমাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন: দেশের সেবা = দেশসেবা, নেই পরোয়া যার = বেপরোয়া ইত্যাদি।

সমাস শব্দের অর্থ:
সমাস সংস্কৃত ভাষার একটি শব্দ। সমাস শব্দের অর্থ হচ্ছে মিলন, সংক্ষেপণ, একপদীকরণ। বাক্যে শব্দের অধিক ব্যাবহার কমানোর জন্য সমাস ব্যাবহৃত হয়।

সমাসের বৈশিষ্ট্য:
সমাসের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিম্নে বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হল –

১। পাশাপাশি দুই বা তার অধিক শব্দ থাকতে হবে।
২। এসব শব্দের মধ্যে অর্থসঙ্গতি থাকতে হবে।
৩। এসব শব্দের মধ্যে বৃহৎ শব্দ তৈরি করার যোগ্যতা থাকতে হবে।
৪। নতুন শব্দ গঠন করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
৫। একাধিক শব্দকে সংকোচন করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
৬। শব্দগুলোর বিভক্তি লোপ পেতে হবে।

সমাসের প্রয়োজনীয়তা:
বাংলা ব্যকরণের সমাসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। নিম্নে সমাসের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হল:
১। শব্দকে সহজভাবে উচ্চারণে সহযোগিতা করে।
২ শব্দকে সংক্ষেপ করার মাধ্যমে সমাস ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
৩। বাক্যের মধ্যে অনাবশ্যক পদের ব্যবহার লোপ করে সমাসবদ্ধ পদের ব্যাবহারের মাধ্যমে বিষয়টিকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করা যায়।
৪। সমাস বাক্যের অর্থকে সহজ ও সাবলীল করে তোলে।
৫। নতুন শব্দ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সমাসের ভূমিকা অনেক।
৬। ভাষায় অর্থদ্যোতনার সৃষ্টি করে বৈচিত্র্যময় দ্যোতনা এনে দেয়।

সমাসের উপাদান:
সমাসের উপাদান ৫টি। যথা:

১। সমস্তপদ / সমাসবদ্ধপদ / সমাসনিষ্পন্ন পদ
২। ব্যাসবাক্য / বিগ্রহ বাক্য / সমাস বাক্য
৩। পূর্বপদ
৪। পরপদ / উত্তরপদ
৫। সমস্যমান পদ

সমাসের এই ৫টি উপাদানকে একত্রে প্রতীতি বলা হয়।

  • সমস্ত পদ: সমাসবন্ধ বা সমাস নিষ্পন্ন পদ কে সমস্ত পদ বলে।
  • সমস্যমান পদ: যে পদগুলোর মিলনে সমাস গঠিত হয় সেই প্রত্যেকটি সমাসবদ্ধ পদকে সমস্যামান পদ বলে।
  • পূর্বপদ ও পরপদ: সমস্যমান পদের মধ্যে অবস্থিত প্রথম পদটিকে পূর্বপদ, এবং পরবর্তী পদকে পরপদ বা উত্তরপদ বলে। পূর্বপদ ও পরপদের মধ্যে অতরিক্ত কোন পদ থাকলে তাকে মধ্যপদ বলে।
  • ব্যাসবাক্য / বিগ্রহ বাক্য / সমাস বাক্য: সমস্ত পদকে ভেঙ্গে যে বাক্যাংশ করা হয়, তাকে সমাসবাক্য বা ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহ বাক্য বলে।

সমাস কত প্রকার ও কি কি
সমাস মূলত ৬ প্রকার। যথা – 

১। দ্বন্দ্ব সমাস

২। কর্মধারয় সমাস

৩। তৎপুরুষ সমাস

৪। বহুব্রীহি সমাস

৫। দ্বিগু সমাস

৬। অব্যয়ীভাব সমাস

সমাসের প্রকারভেদ

দ্বন্দ্ব সমাস:
দ্বন্দ্ব শব্দের অর্থ সংঘাত বা বিবাদ হলেও সমাসের ক্ষেত্রে ‘দ্বন্দ্ব’ শব্দটি মিলন, জোড়া ও যুগল অর্থে ব্যবহৃত হয়। দা সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থের প্রাধান্য থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: মা-বাবা = মা বা, দাদ

সাদা ও কালো, কালি-কলম কালি ও কলম, রাজ বাদশা = রাজা ও বাদশা।

দ্বন্দ্ব সমাস চেনার উপায়:
পূর্বপদ ও পরপদের অর্থ প্রধান।
পূর্বপদ ও পরপদে একই পদ বসে।
পূর্বপদ ও পরপদের মাঝে হাইফেন (-) বসে।
পূর্বপদে অপেক্ষাকৃত সম্মানিত ব্যক্তি বসে।
পূর্বপদে স্ত্রীবাচক ও পরপদে পুরুষবাচক শব্দ বসে।
ব্যাসবাক্যে সাধারণত ‘ও’ বসে।
গঠনপ্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দ্বন্দ্ব সমাসকে ৮ ভাগে ভাগ করা যায়:

১। সাধারণ দ্বন্দ্ব: সাধারণত একাধিক পদ একসাথে অবস্থান করলে তাকে সাধারণ দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: কালিকলম = কালি ও কলম, লতাপাতা = লতা ও পাতা, সৈন্যসামন্ত = সৈন্য ও সামন্ত, রক্ত-মাংস = রক্ত ও মাংস ইত্যাদি।

২। মিলনার্থক দ্বন্দ্ব: একাধিক পদের মিলন বোঝাতে যে দ্বন্দ্ব সমাস হয় থাকে মিলনার্থক দ্বন্দ্ব বলে। যেমন: চা-বিস্কুট = চা ও বিস্কুট, জিনপরি = জিন ও পরি, মা-বাপ = মা ও বাপ ইত্যাদি।

৩। সম্বন্ধবাচক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে সমন্ধ বোঝায় তাকে সম্বন্ধবাচক দ্বন্দ্ব বলে। যেমন: দম্পতি = জায়া ও পতি, মাসি-পিসি = মাসি ও পিসি, কাকা-কাকি = কাকা ও কাকি ইত্যাদি।

৪। সমার্থক দ্বন্দ্ব: পূর্বপদ ও পরপদে সমার্থক শব্দ মিলিত হয়ে যে দ্বন্দ্ব সমাস হয় তাকে সমার্থক দ্বন্দ্ব বলে। যেমন: হাট-বাজার = হাট ও বাজার, জনমানব জন ও মানব, সুখশান্তি সুখ ও শান্তি ইত্যাদি।

৫. বিরোধার্থক বা বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব: পূর্বপদ ও পরপদের বিপরীত শব্দ মিলিত হয়ে যে দ্বন্দ্ব সমাস হয় তাকে বিরোধার্থক বা বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন: হিতাহিত হিত ও অহিত, অহিনকুল = অহি ও নকুল, মরাবাঁচা = মরা ও বাঁচা, ছোটোবড়ো = ছোটো ও বড়ো, ভালো-মন্দ = ভালো ও মন্দ, দাকুমড়া = দা ও কুমড়া, সুখদুঃখ = সুখ ও দুঃখ, ভরণপোষণ = ভরণ ও পোষণ ইত্যাদি।

৬. একশেষ দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে প্রধান পদটি অবশিষ্ট থেকে অন্য পদের লোপ হয় এবং শেষ পদ অনুসারে শব্দের রূপ নির্ধারিত হয় তাকে একশেষ দ্বন্দ্ব বলে। যেমন: আমরা = সে, তুমি ও আমি: আমাদের = তার, তোমার ও আমার; তোরা = সে ও তুই ইত্যাদি।

৭. বহুপদী দ্বন্দ্ব: বছ পদ মিলে যে স্বন্দ্ব সমাস হয় তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন। তেল-নুন-লাকড়ি = তেল, নুন ও লাকড়ি। নাক-কান-গলা = নাক, কান ও গলা। স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল = স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল ইত্যাদি।

৮. অলুক দ্বন্দ্ব: যে দ্বন্দ্ব সমাসে সমস্যমান পদগুলোর বিভক্তি সমস্ত পদেও যুক্ত থাকে বা বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন। দুধে-ভাতে = দুধে ও ভাতে, হাতে-কলমে = হাতে ও কলমে, ধীরেসুস্থে = ধীরে ও সুস্থে ইত্যাদি।

দ্বিগু / দ্বিগু কর্মধারয় সমাস
যে সমাসে সংখ্যাবাচক শব্দ পূর্বে বলে এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায় তাকে দ্বিগু/ দ্বিগু কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: দ্বিগু = গো-র সমাহার।

দ্বিগু / দ্বিগু কর্মধারয় সমাস চেনার উপায়:
পরপদের অর্থ প্রধান
পূর্বপদে সংখ্যা থাকবে
পরপদ বিশেষ্য হবে
সমস্তপদ বিশেষ্য হবে
ব্যাসবাক্যে ‘সমাহার’ শব্দটি বসবে
দ্বিগু সমাসের বিপরীত সমাস অব্যয়ীভাব
✓ বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রমিত ব্যাকরণে দ্বিগু সমাসকে কর্মধারয় সমাসের মধ্যে রাখা হয়েছে। যে কারণে এটির নতুন নাম হয়েছে ‘দ্বিগু কর্মধারয়’।

কর্মধারয় সমাস:
বিশেষ্য ও বিশেষণ পদের যে সমাস হয় তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। যেমন: কাঁচকলা = কাঁচা যে কলা

কর্মধারয় সমাস চেনার উপায়:
কর্মধারয় সমাসে পরপদের অর্থ প্রধান।
বিশেষ্য ও বিশেষণ পদ দ্বারা কর্মধারয় সমাস হয়।
সমস্তপদ দ্বারা সাধারণত কোনো গুণ বোঝায়।
ব্যাসবাক্যে সাধারণত যে-সে, যিনি-তিনি, ন্যায়, মতো, রূপ বসে।
কর্মধারয় সমাসের বিপরীত অব্যয়ীভাব।
কর্মধারয় সমাসের প্রকারভেদ:
কর্মধারয় সমসকে সাধারণত ৪ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:

১। সাধারন কর্মধারয়

২। মধ্যপদলোপী কর্মধারয়

৩। উপমামূলক কর্মধারয়

৪। রূপক কর্মধারয় সমাস

  • সাধারণ কর্মধারয়: মধ্যপদলোপী ও উপমামূলক কর্মধারয় সমাস ছাড়া অন্যান্য কর্মধারয় সমাসকে সাধারণ কর্মধারয় সমাস বলা হয়।
  • মধ্যপদলোপী কর্মধারয়: ব্যাসবাক্যের মাঝের পদ লোপ পেয়ে যে কর্মধারয় সমাস হয় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে। উদাহরণ: সিংহাসন = সিংহ চিহ্নিত আসন , সাহিত্যসভা = সাহিত্য বিষয়ক সভা, রান্নাঘর = রান্না করার ঘর ।
  • উপমামূলক কর্মধারয় সমাস: যে সমাসে পূর্বপদ ও পরপদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে দোষ-গুণ বা বৈশিষ্ট্যের সাদৃশ্য বা তুলনা করা হয় তাকে উপমামূলক কর্মধারয় সমাস বলে।
  • উপমান ও উপমেয়ের মধ্যে অভেদ বা মিল কল্পনা করে যে সমাস গঠিত হয় তাকে রূপক কর্মধারয় সমাস বলে। এক্ষেত্রে ব্যাসবাক্যের মাঝে 'রূপ' শব্দটি ব্যবহৃত হয়।যেমন: বিষাদ রূপ সিন্ধু = বিষাদসিন্ধু, ক্রোক রূপ অনল = ক্রোধানল।

তৎপুরুষ / কারকলোপী সমাস:
পূর্বপদের বিভক্তি লোপে ও পরপদের অর্থ প্রধান হয়ে যে সমাস হয় তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। মনে রাখা জরুরি যে ব্যাসবাক্যের পূর্বপদে অবশ্যই বিভক্তি থাকবে, যা সমস্তপদে লোপ পাবে এবং এই বিভক্তির নামানুসারে তৎপুরুষ সমাসের নাম হবে।

তৎপুরুষ / কারকলোপী সমাস চেনার উপায়:
তৎপুরুষ সমাসে পরপদের অর্থ প্রধান।
পূর্বপদের বিভক্তি লোপে তৎপুরুষ সমাস হয়।
দ্বিতীয়া থেকে সপ্তমী পর্যন্ত বিভক্তির নাম অনুসারে হয়।
তৎপুরুষ সমাসের প্রকারভেদ:
তৎপুরুষ সমাস ৯ প্রকার। যথা –

১। দ্বিতীয়া তৎপুরুষ বা কর্মতৎপুরু

২। তৃতীয়া তৎপুরুষ

৩। চতুর্থী তৎপুরুষ

৪। পঞ্চমী তৎপুরুষ

৫। ষষ্ঠী তৎপুরুষ

৬। সপ্তমী তৎপুরুষ

৭। নঞ্ তৎপুরুষ

৮। উপপদ তৎপুরুষ

৯। অলুক তৎপুরুষ

  • দ্বিতীয়া তৎপুরুষ বা কর্মতৎপুরুষ: পূর্বপদে দ্বিতীয় বিভক্তি (কে) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ হয় তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন – শরনিক্ষেপ – শরকে নিক্ষেপ, রথ দেখা – রথকে দেখা, সাহায্যপ্রাপ্ত – সাহায্যকে প্রাপ্ত, বিপদাপন্ন – বিপদকে আপন্ন।

  • তৃতীয়া তৎপুরুষ বা করণৎপুরুষ: পূর্বপদে তৃতীয়া বিভক্তি (দ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ হয় তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। শ্রমলব্ধ = শ্রম দ্বারা লব্ধ, ছায়াশীতল = ছায়া দ্বারা শীতল, মধুমাখা = মধু দ্বারা মাখা।

  • চতুর্থী তৎপুরুষ বা সম্প্রদান তৎপুরুষ: পূর্বপদে চতুর্থী বিভক্তি (কে, জন্য, নিমিত্ত) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন – রান্নাঘর = রান্নার জন্য ঘর, দেবভক্তি = দেবকে ভক্তি, বসতবাটী = বসতের নিমিত্তে বাটী ইত্যাদি।

  • পঞ্চমী তৎপুরুষ বা অপাদান তৎপুরুষ: পুর্বপদে পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে, চেয়ে) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলে। সাধারণত চ্যুত, জাত, আগত, ভীত, গৃহীত, বিরত, মুক্ত, উত্তীর্ণ, পালানো, ভ্রষ্ট ইত্যাদি বোঝালে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন – বিলাতফেরত – বিলাত হতে ফেরত, স্কুল পালানো – স্কুল থেকে পালানো,

  • ষষ্ঠী তৎপুরুষ বা সম্বন্ধ তৎপুরুষ: পূর্বপদে ষষ্ঠী বিভক্তি (র, এর) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন – চা-বাগান = চায়ের বাগান, রাজহংস = হাসের রাজা।

  • সপ্তমী তৎপুরুষ বা অধিকরণ তৎপুরুষ: পূর্বপদে সপ্তমী বিভক্তি (এ, য়, তে) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস বলে।

  • নঞ্ তৎপুরুষ: নঞ্ শব্দের অর্থ ‘না’। পূর্বপদে না বাচক অব্যয় (অ, অনা, বে, বি, না, নি, গর) বসে যে তৎপুরুষ হয় তাকে নঞ্ তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন – অবিশ্বাস = নয় বিশ্বাস, অনাদর = না আদর, অজানা = নাই জানা।

  • উপপদ তৎপুরুষ: যে পদের পরবর্তী ক্রিয়ামূলের সঙ্গে কৃৎ-প্রত্যয় যুক্ত হয় সে পদকে উপপদ বলে। কৃদন্ত পদের সঙ্গে উপপদের যে সমাস হয়, তাকে বলে উপপদ তৎপুরুষ সমাস। যেমন – জলে চরে যা = জলাচর, জল দেয় যে = জলদ, পঙ্কে জম্নে যা = পঙ্গজ। এরুপ – সত্যবাদী, ছেলেধরা, পকেটমার, পাতাচাটা, হাড়ভাঙ্গা, মাছিমারা, ছারপোকা, ঘরপোড়া, বর্ণচোরা, পা-চাটা, ছা-পোষা ইত্যাদি।

  • অলুক / অলোপ তৎপুরুষ: ব্যাসবাক্যের বিভক্তি পূর্বপদে লোপ না পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে।

বহুব্রীহি সমাস:
যে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্য কোন ব্যাক্তি, বস্তু, ধারনাকে বোঝায় তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: দশানন = দশ আনন (মস্তক) যার।

বহুব্রীহি সমাস চেনার উপায়:
বহুব্রীহি সমাস দ্বন্দ্ব সমাসের বিপরীত
বহুব্রীহি সমাসে কোনো পদের অর্থই প্রধান হয় না
ব্যাসবাক্যে যার, যা বসে বহুব্রীহি সমাস হয়
বহুব্রীহি সমাস আট প্রকার।
বহুব্রীহি সমাসের প্রকারভেদ:

১। সমানাধিকরণ

২। ব্যাধিকরন

৩। ব্যাতিহার

৪। মধ্যপদলোপী

৫। নঞ্

৬। প্রত্যয়ান্ত

৭। সংখ্যাবাচক

৮। অলুক

  • সমানাধিকরণ বহুব্রীহি : পূর্বপদ বিশেষ্য ও পরপদ বিশেষণ কিংবা পূর্বপদ বিশেষণ ও পরপদ বিশেষ্য হলে তাকে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন – কানকাটা = কান কাটা যার, ঘরপোড়া = ঘর পোড়া যার।
  • ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি: পূর্বপদ ও পরপদ বিশেষ্য হলে, অর্থাৎ পূর্বপদ ও পরপদের কোনোটাই বিশেষণ না হলে ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস হয়। যেমন – আশীবিষ = আশীতে বিষ যার, বজ্রদেহ = বজ্রতে দেহ যার।

  • ব্যতিহার বহুব্রীহি: ক্রিয়ার পারস্পরিক অর্থে ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস হয়। এ সমাসে পূর্বপদে ‘আ’ এবং পরপদে ‘ই’ যত হয়। এ সমাসের পূর্বপদ ও পরপদ বিশেষ্য হয়। যেমন – হাতাহাতি = হাতে হাতে যে যুদ্ধ, কানাকানি = কানে কানে যে কথা।

  • মধ্যপদলোপী বা পদলোপী বহুব্রীহি / উপমাত্মক বহুব্রীহি:বহুব্রীহি সমাসের ব্যাখ্যার জন্য ব্যাবহৃত ব্যাক্যাংশের কোন অংশ যদি সমস্তপদে লোপ পায়, তবে তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি বলে। যেমন – সোনামুখী = সোনার মতো উজ্জ্বল মুখ যার, মৃগনয়না = মৃগের ন্যায় নয়ন যার।

  • নঞ্ বহুব্রীহি: না-বোধক অব্যয় পদের সঙ্গে বিশেষ্য পদের বহুব্রীহি সমাস হলে তাকে নঞ্ বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন – অজ্ঞান = নেই জ্ঞাণ যার, নর্ভুল = নেই ভুল যার।

  • প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি: যে বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদে আ, এ, ও প্রত্যয় যুক্ত হয় তাকে প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন – একচোখা = এক দিকে চোখ যার, একরোখা – এই দিকে রোখ যার।

  • সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি: পূর্বপদ সংখ্যাবাচক, পরপদ বিশেষ্য এবং সমস্তপদ বিশেষণ বোঝালে তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি বলে। যেমন – দশভুজ = দশভুজ যার, সপ্তবর্ণা = সপ্ত বর্ণ যার।

  • অলুক বহুব্রীহি: যে বহুব্রীহি সমাসে ব্যাসবাক্যের বিভক্তি পূর্বপদে লোপ পায় না তাকে অলুক বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন – মাথায়পাগড়ি = মাথায় পাগড়ি যার, গলায়গামছা = গলায় গামাছা যার।

অব্যয়ীভাব সমাস:
পূর্বপদে অব্যয়যোগে নিষ্পন্ন সমাসে যদি অব্যয়ের অর্থই প্রধান হয়, তবে তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। যেমন- উপকূল = কূলের সমীপে, প্রতিদিন = দিন দিন।

অব্যয়ীভাব সমাস চেনার উপায়:
অব্যয়ীভাব’ অর্থ অব্যয়ের ভাব বর্তমান।
অব্যয়ীভাব সমাস দ্বিগু, কর্মধারয় ও তৎপুরুষের বিপরীত।
অব্যয়ীভাব সমাসে পূর্বপদে উপসর্গ ও পরপদে বিশেষ্য থাকে।
উপসর্গযোগে গঠিত প্রায় সব শব্দই অব্যয়ীভাব সমাস।

সমাস চেনার সহজ উপায়:

১। দ্বন্দ্ব সমাসের ক্ষেত্রে ব্যাস ব্যাকের মাঝে ও, এবং, আর এই তিনটি শব্দ থাকে।

২। কর্মধারয় সমাসের ক্ষেত্রে ব্যাস ব্যাক্যে যে বা যিনি উল্লেখ থাকবে এবং সমস্তপদের দ্বারা তুলনা বোঝাবে।

৩। দ্বিগু সমাসের ক্ষেত্রে ব্যাস বাক্যে সংখ্যা জাতীয় শব্দ থাকবে এবং ‘সমাহার’ শব্দটি থাকবে।

৪। তৎপুরুষ সমাসের ক্ষেত্রে ব্যাস বাক্যে বিভক্তিসমূহ থাকবে।

৫। অব্যয়ীভাব সমাসের ক্ষেত্রে পূর্বপদ হিসেবে অব্যয় থাকবে।

৬। বহুব্রীহি সমাসের ব্যাসবাক্যে ‘যার’ শব্দটি থাকবে এবং সমস্যমান পদগুলোর নিজস্ব অর্থবাদে ভিন্নধর্মী অর্থে সমস্তপদ তৈরি হবে।