বাংলা ভাষার পদ প্রকরণঃ
বাক্যে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি শব্দই এক একটি পদ
পদ প্রধানত দুই প্রকার। যেমন: সব্যয় পদ ও অব্যয় পদ।
সব্যয় পদ চার প্রকার। যেমন: ১. বিশেষ্য ২. সর্বনাম ৩. বিশেষণ ৪. ক্রিয়া
পদ মোট পাঁচ প্রকার। যেমন: ১. বিশেষ্য ২. সর্বনাম ৩. বিশেষণ ৪. ক্রিয়া ৫. অব্যয়।
বিশেষ্য পদ: কোনো কিছুর নামকে বিশেষ্য পদ বলে। বাক্যের মধ্যে ব্যবহৃত যে সমস্ত পদ দ্বারা কোনো ব্যক্তি, জাতি, সমষ্টি, বস্তু, স্থান, কাল, বার, কর্ম বা গুণের নাম বোঝানো হয় তাদের বিশেষ্য পদ বলে।
বিশেষ্য পদ ছয় প্রকার। যেমন:
১. নামবাচক বা সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য / Proper Noun
২. জাতিবাচক বিশেষ্য / Common Noun
৩. বস্তুবাচক বা দ্রব্যবাচক বিশেষ্য / Material Noun
৪. সমষ্টিবাচক বিশেষ্য / Collecti Noun
৫. ভাববাচক বিশেষ্য / Verbal Noun
৬. গুণবাচক বিশেষ্য / Abstract Noun
- নামবাচক বিশেষ্য: যে পদ দ্বারা কোনো ব্যক্তি, ভৌগোলিক স্থান, গ্রন্থ ইত্যাদির নাম বা সংজ্ঞা প্রকাশ পায় তাকে নামবাচক বা সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য বলে। যেমন:
ক) ব্যক্তির নাম: নজরুল, ওমর, আনিস, মাইকেল
খ) ভৌগোলিক স্থানের ঢাকা, দিল্লি, লন্ডন, মক্কা
গ) ভৌগোলিক সংজ্ঞা: (নদী, পর্বত, সমুদ্র ইত্যাদি)-মেঘনা, হিমালয়, আরব সাগর
ঘ) গ্রন্থের নাম: গীতাঞ্জলি, অগ্নিবীণা, দেশে-বিদেশে, বিশ্বনবি
- জাতিবাচক বিশেষ্যঃ যে পদ দ্বারা কোনো একজাতীয় প্রাণী বা পদার্থের সাধারণ নাম বোঝায় তাকে জাতিবাচক বিশেষ্য বলে। যেমন: মানুষ, গরু, পাখি, গাছ, পর্বত, নদী, ইংরেজ।
- বস্তুবাচক বা দ্রব্যবাচক বিশেষ্য: যে পদে কোনো উপাদানবাচক পদার্থের নাম বোঝায় তাকে বস্তুবাচক বা দ্রব্যবাচক বিশেষ্য বলে। এই জাতীয় বস্তুর সংখ্যা ও পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। যেমন: বই, খাতা, কলম, থালা, বাটি, মাটি, চাল, চিনি, লবণ, পানি।
- সমষ্টিবাচক বিশেষ্য: যে পদে বেশকিছু সংখ্যক ব্যক্তি বা প্রাণীর সমষ্টি বোঝায় তাই সমষ্টিবাচক বিশেষ্য। যেমন সভা, জনতা, সমিতি, পঞ্চায়েত, মাহফিল, ঝাঁক, বহর, দল।
- ভাববাচক বিশেষ্য: যে বিশেষ্য পদে কোনো ক্রিয়ার ভাব বা কাজের ভাব প্রকাশিত হয় তাকে ভাববাচক বিশেষ্য বলে। যেমন: গমন (যাওয়ার ভাব বা কাজ), দর্শন (দেখার কাজ), ভোজন (খাওয়ার কাজ), শয়ন (শোয়ার কাজ), দেখা, শোনা।
- গুণবাচক বিশেষ্য: যে বিশেষ্য দ্বারা কোনো বস্তুর দোষ বা গুণের নাম বোঝায় তাই গুণবাচক বিশেষ্য। যেমন: মধুর মিষ্টত্বের গুণ-মধুরতা তরল দ্রব্যের গুণ-তারল্য তিক্ত দ্রব্যের দোষ বা গুণ-তিক্ততা তরুণের গুণ-তারুণ্য এরূপ: সৌরভ, স্বাস্থ্য, যৌবন, সুখ, দুঃখ।
সর্বনাম পদ: বিশেষ্যের পরিবর্তে যে পদ ব্যবহৃত হয় তাকে সর্বনাম পদ বলে। সর্বনাম সাধারণত ইতোপূর্বে ব্যবহৃত বিশেষ্যের প্রতিনিধি স্থানীয় শব্দ।
বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সর্বনামকে ১০ ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন:
১. ব্যক্তিবাচক বা পুরুষবাচক: আমি, আমরা, তুমি, তোমরা, সে, তারা, তাহারা, তিনি, তাঁরা, এ, এরা, ও, ওরা
২. আত্মবাচক: স্বয়ং, নিজে, খোদ, আপনি
৩. সামীপ্যবাচক: এ, এই, এরা, ইহারা, ইনি
৪. দূরত্ববাচক: ঐ, ঐসব ইত্যাদি
৫. সাকুল্যবাচক সব, সকল, সমুদয়, তাবৎ
৬. প্রশ্নবাচক: কে, কি, কী, কোন, কাহার, কার, কিসে
৭. অনির্দিষ্টতাজ্ঞাপক: কোন, কেহ, কেউ, কিছু
৮. ব্যতিহারিক: আপনা আপনি, নিজে নিজে, আপসে, পরস্পর
৯. সংযোগজ্ঞাপক: যে, যিনি, যাঁরা, যারা, যাহারা
১০. অন্যাদিবাচক: অন্য, অপর, পর
বিশেষণ পদ: যে পদ বিশেষ্য, সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের দোষ, গুণ, অবস্থা, সংখ্যা, পরিমাণ ইত্যাদি প্রকাশ করে তাকে বিশেষণ পদ বলে। যেমন: চলন্ত গাড়ি: বিশেষ্যের বিশেষণ।
করূণাময় তুমি: সর্বনামের বিশেষণ।
দ্রুত চল: ক্রিয়া বিশেষণ।
বিশেষণ দুই ভাগে বিভক্ত। যেমন:
- নাম বিশেষণ: যে বিশেষণ পদ কোনো বিশেষ্য বা সর্বনাম পদকে বিশেষিত করে তাকে নাম বিশেষণ বলে।
- ভাব বিশেষণ: যে পদ বিশেষ্য ও সর্বনাম ভিন্ন অন্য পদকে বিশেষিত করে তাই ভাব বিশেষণ।
নাম বিশেষণ :
• বিশেষ্যের বিশেষণ: সুস্থ সবল দেহকে কে না ভালোবাসে?
• সর্বনামের বিশেষণ: সে রূপবান ও গুণবান।
নাম বিশেষণকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন:
ক) রূপবাচক: নীল আকাশ, সবুজ মাঠ, কালো মেঘ
খ) গুণবাচক: চৌকস লোক, দক্ষ কারিগর, ঠান্ডা হাওয়া
গ) অবস্থাবাচক: তাজা মাছ, রোগা ছেলে, খোঁড়া পা
ঘ) সংখ্যাবাচক: হাজার লোক, দশ দশা, শ টাকা
ঙ) ক্রমবাচক: দশম শ্রেণি, সত্তর পৃষ্ঠা, প্রথমা কন্যা
চ) পরিমাণবাচক: বিঘাটেক জমি, পাঁচ শতাংশ ভূমি, হাজার টনী জাহাজ, এক কেজি চাল, দুকিলোমিটার রাস্তা
ছ) অংশবাচক: অর্ধেক সম্পত্তি, ষোল আনা দখল, সিকি পথ
জ) উপাদানবাচক: বেলে মাটি, মেটে কলসি, পাথুরে মূর্তি
ঝ) প্রশ্নবাচক: কতদূর পথ? কেমন অবস্থা?
ঞ) নির্দিষ্টতাজ্ঞাপক: এই লোক, সেই ছেলে, ছাব্বিশে মার্চ
ভাব বিশেষণ: যে পদ বিশেষ্য ও সর্বনাম ভিন্ন অন্য পদকে বিশেষিত করে তাই ভাব বিশেষণ। ভাব বিশেষণ চার প্রকার। যেমন:
১. ক্রিয়া বিশেষণ: যে পদ ক্রিয়া সংঘটনের ভাব, কাল বা রূপ নির্দেশ করে তাকে ক্রিয়া বিশেষণ বলে। যেমন:
ক্রিয়া সংগঠনের ভাব: ধীরে ধীরে বায়ু বয়।
ক্রিয়া সংগঠনের কাল পরে একবার এসো।
২. বিশেষণীয় বিশেষণ: যে পদ নাম বিশেষণ অথবা ক্রিয়া বিশেষণকে বিশেষিত করে তাকে বিশেষণীয় বিশেষণ বলে। যেমন:
ক) নাম বিশেষণের বিশেষণ: সামান্য একটু দুধ দাও। এ ব্যাপারে সে অতিশয় -দুঃখিত।
খ) ক্রিয়া বিশেষণের বিশেষণ: রকেট অতি দ্রুত চলে।
৩. অব্যয়ের বিশেষণ যে ভাব বিশেষণ অব্যয় পদ অথবা অব্যয় পদের অর্থকে বিশেষিত করে তাকে অব্যয়ের বিশেষণ বলে। যেমন: ধিক্ তারে, শত ধিক্ নির্লজ্জ যে জন।
৪. বাক্যের বিশেষণ: কখনো কখনো কোনো বিশেষণ পদ একটি সম্পূর্ণ বাক্যকে বিশেষিত করতে পারে তখন তাকে বাক্যের বিশেষণ বলা হয়। যেমন: দুর্ভাগ্যক্রমে দেশ আবার নানা সমস্যাজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাস্তবিকই আজ আমাদের কঠিন পরিশ্রমের প্রয়োজন।
বিভিন্নভাবে বিশেষণ গঠন করা যায়। যেমন:
ক) ক্রিয়াজাত: হারানো সম্পত্তি, খাবার পানি, অনাগত দিন
খ) অব্যয়জাত: আচ্ছা মানুষ, উপরি পাওনা, হঠাৎ বড়লোক
গ) সর্বনাম জাত: কবেকার কথা, কোথাকার কে, স্বীয় সম্পত্তি
ঘ) সমাসসিদ্ধ: বেকার, নিয়ম-বিরুদ্ধ, জ্ঞানহারা চৌচালা ঘর
ঙ) বীপ্সামূলক: হাসিহাসি মুখ, কাঁদকাঁদ চেহারা, ডুবুডুবু নৌকা
চ) অনুকার অব্যয়জাত কনকনে শীত, শনশনে হাওয়া, ধিকিধিকি আগুন, টসটসে ফল, তকতকে মেঝে
ছ) কৃদন্ত: কৃতী সন্তান, জানাশোনা লোক, পায়েচলা পথ, হৃত সম্পত্তি, অতীত কাল
জ) তদ্ধিতান্ত: জাতীয় সম্পদ, নৈতিক বল, মেঠো পথ
ঝ) উপসর্গযুক্ত: নিখুঁত কাজ, অপহৃত সম্পদ, নির্জলা মিথ্যে
ঞ) বিদেশি: নাস্তানাবুদ অবস্থা, লাওয়ারিশ মাল, লাখেরাজ সম্পত্তি, দরপত্তনি তালুক
বিশেষণের অতিশায়ন: বিশেষণ পদ যখন দুই বা ততোধিক বিশেষ্য পদের মধ্যে গুণ, অবস্থা, পরিমাণ প্রভৃতি বিষয়ে তুলনায় একের উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বুঝিয়ে থাকে তখন তাকে বিশেষণের অতিশায়ন বলে। যেমন: যমুনা একটি দীর্ঘ নদী, পদ্মা দীর্ঘতর কিন্তু মেঘনা বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী। সূর্য, পৃথিবী ও চন্দ্রের মধ্যে তুলনায় সূর্য বৃহত্তম, পৃথিবী চন্দ্রের চেয়ে বৃহত্তর এবং চন্দ্র পৃথিবী অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর।
বিশেষণের অতিশায়ন দুই প্রকার। যেমন: বাংলা শব্দের অতিশায়ন ও তৎসম শব্দের অতিশায়ন।
একই পদের বিশেষ্য ও বিশেষণ রূপে প্রয়োগ (পদ প্রকরণ)
বাংলা ভাষায় একই পদ বিশেষ্য ও বিশেষণ রূপে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন:
১. ভালো
বিশেষণ রূপে- ভালো বাড়ি পাওয়া কঠিন।
বিশেষ্য রূপে- আপন ভালো সবাই চায়।
২. মন্দ
বিশেষণ রূপে- মন্দ কথা বলতে নাই।
বিশেষ্য রূপে- এখানে কী মন্দটা তুমি দেখলে?
৩. পূণ্য
বিশেষণ রূপে- তোমার এ পূণ্য প্রচেষ্টা সফল হোক।
বিশেষ্য রূপে- পূণ্যে মতি হোক।
৪. নিশীথ
বিশেষণ রূপে- নিশীথ রাতে বাজছে বাঁশি।
বিশেষ্য রূপে- গভীর নিশীথে প্রকৃতি সুপ্ত।
৫. শীত
বিশেষণ রূপে- শীতকালে কুয়াশা পড়ে।
বিশেষ্য রূপে- শীতের সকালে চারদিক কুয়াশায় অন্ধকার।
৬. সত্য
বিশেষণ রূপে- সত্য পথে থেকে সত্য কথা বল।
বিশেষ্য রূপে- এ এক বিরাট সত্য।
অব্যয় পদের সংজ্ঞা ও পদ প্রকরণ-
যার ব্যয় বা পরিবর্তন হয় না অর্থাৎ যা অপরিবর্তনীয় শব্দ তাই অব্যয়। অব্যয় শব্দের সাথে কোনো বিভক্তিচিহ্ন যুক্ত হয় না, সেগুলোর একবচন বা বহুবচন হয় না এবং সেগুলোর স্ত্রী ও পুরুষবাচকতা নির্ণয় করা যায় না।
অব্যয় পদ: যে পদ সর্বদা অপরিবর্তনীয় থেকে কখনো বাক্যের শোভা বর্ধন করে, কখনো একাধিক পদের, বাক্যাংশের বা বাক্যের সংযোগ বা বিয়োগ সম্বন্ধ ঘটায় তাকে অব্যয় পদ বলে।
উৎস বা উৎপত্তি অনুসারে বাংলা ভাষায় তিন প্রকার অব্যয় শব্দ/পদ রয়েছে। যেমন:
১. বাংলা অব্যয় শব্দ: আর, আবার, ও, হ্যাঁ, না ইত্যাদি।
২. তৎসম অব্যয় শব্দ যদি, যথা, সদা, সহসা, হঠাৎ, অর্থাৎ, দৈবাৎ, বরং, পুনশ্চ, আপাতত, বস্তুর ইত্যাদি। ‘এবং ও ‘সুতরাং’ তৎসম শব্দ হলেও বাংলায় এগুলোর অর্থ পরিবর্তিত হয়েছে। সংস্কৃতে ‘এবং’ শব্দের অর্থ এমন, আর ‘সুতরাং’ অর্থ অত্যন্ত, অবশ্য। কিন্তু-ও (বাংলা), সুতরাং-অতএব (বাংলা)
৩. বিদেশি অব্যয় শব্দ আলবত, বহুত, খুব, শাবাণ, খাসা, মাইরি, মারহাবা ইত্যাদি।
ব্যবহার অনুসারে অব্যয় প্রধানত চার প্রকার। যেমন:
১. সমুচ্চয়ী অব্যয় (সংযোজক, বিয়োজক, সংকোচক)
২. অনন্বয়ী অব্যয়
৩. অনুসর্গ (বিভক্তিসূচক, বিভক্তিসম)
৪. অনুকার বা ধ্বন্যাত্মক অব্যয়
বিবিধ উপায়ে গঠিত অব্যয় শব্দ
১. একাধিক অব্যয় শব্দযোগে কদাপি, নতুবা, অতএব, অথবা ইত্যাদি।
২. আনন্দ বা দুঃখ প্রকাশক একই শব্দের দুইবার প্রয়োগে ছি ছি, ধিক্ ধিক্ বেশ ইত্যাদি।
৩. দুটি ভিন্ন শব্দযোগে মোটকথা, হয়তো, যেহেতু, নইলে
৪. অনুকার শব্দযোগে কুহু কুহু, গুন গুন, ঘেউ ঘেউ, শন শন, ছল ছল, কন কন ইত্যাদি।
সমুচ্চয়ী অব্যয়
যে অব্যয় পদ একটি বাক্যের সঙ্গে অন্য একটি বাক্যের অথবা বাক্যস্থিত একটি পদের সঙ্গে অন্য একটি পদের সংযোজন, বিয়োজন বা সংকোচন ঘটায় তাকে সমুচ্চয়ী অব্যয় বা সম্বন্ধবাচক অব্যয় বলে।
ক) সংযোজক অব্যয়
১. উচ্চপদ ও সামাজিক মর্যাদা সকলেই চায়। এখানে ‘ও’ অব্যয়টি বাক্যস্থিত দুটি পদের সংযোজন করছে।
২. তিনি সৎ, তাই সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা করে। এখানে ‘তাই’ অব্যয়টি দুটি বাক্যের সংযোজন ঘটাচ্ছে। আর, অধিকন্তু, সুতরাং শব্দগুলোও সংযোজক অব্যয়।
খ) বিয়োজক অব্যয়
১. হাসেম কিংবা কাসেম এর জন্য দায়ী। এখানে ‘কিংবা’ অব্যয়টি দুটি পদের (হাসেম এবং কাসেমের) বিয়োগ সম্বন্ধ ঘটাচ্ছে।
২. ‘মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’। এখানে ‘কিংবা’ অব্যয়টি দুটি বাক্যাংশের বিয়োজক। আমরা চেষ্টা করেছি বটে কিন্তু কৃতকার্য হতে পারিনি। এখানে ‘কিন্তু’ অব্যয় দুটি বাক্যের বিয়োজক। বা, অথবা, নতুবা, না হয়, নয়তো শব্দগুলো বিয়োজক অব্যয়।
গ) সংকোচক অব্যয় তিনি বিদ্বান অথচ সৎ ব্যক্তি নন। এখানে ‘অথচ’ অব্যয়টি দুটি বাক্যের মধ্যে ভাবের সংকোচ সাধন করেছে। কিন্তু, বরং শব্দগুলোও সংকোচক অব্যয়।
অনুগামী সমুচ্চয়ী অব্যয়: যে, যদি, যদিও, যেন প্রভৃতি কয়েকটি শব্দ সংযোজক অব্যয়ের কাজ করে থাকে। তাই তাদের অনুগামী সমুচ্চয়ী অব্যয় বলে। যেমন:
১. তিনি এত পরিশ্রম করেন যে তার স্বাস্থ্যভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কা আছে।
২. আজ যদি (শর্তবাচক) পারি, একবার সেখানে যাব।
৩. এভাবে চেষ্টা করবে যেন কৃতকার্য হতে পার।
অনন্বয়ী অব্যয়
যে সকল অব্যয় বাক্যের অন্য পদের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ না রেখে স্বাধীনভাবে নানাবিধ ভাব প্রকাশে ব্যবহৃত হয় তাদের অনন্বয়ী অব্যয় বলে। যেমন:
ক) উচ্ছ্বাস প্রকাশে: মরি মরি! কী সুন্দর প্রভাতের রূপ।
খ) স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি জ্ঞাপনে: হ্যাঁ, আমি যাব। না, আমি যাব না।
গ) সম্মতি প্রকাশে: আমি আজ আলবত যাব। নিশ্চয়ই পারব।
ঘ) অনুমোদনবাচকতায় আপনি যখন বলছেন, বেশ তো আমি যাব।
ঙ) সমর্থনসূচক জবাবে আপনি যা জানেন তা তো ঠিকই বটে।
চ) যন্ত্রণা প্রকাশে: উঃ! পায়ে বড্ড লেগেছে। নাঃ! এক অসহ্য।
ছ) ঘৃণা বা বিরক্তি প্রকাশে ছি ছি! তুমি এত নীচ। কী আপদ! লোকটা যে পিছু ছাড়ে না।
জ) সম্বোধনে: ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।
ঝ) সম্ভাবনায়: সংশয়ে সংকল্প সদা টলে, পাছে লোকে কিছু বলে।
ঞ) বাক্যালংকার অব্যয়: কয়েকটি অব্যয় শব্দ নিরর্থকভাবে ব্যবহৃত হয়ে বাক্যের শোভাবর্ধন করে, এদের বাক্যালংকার অব্যয় বলে।
অনুসর্গ অব্যয়
যে সকল অব্যয় শব্দ বিশেষ্য ও সর্বনাম পদের বিভক্তির ন্যায় বসে কারকবাচকতা প্রকাশ করে তাদের অনুসর্গ অব্যয় বলে। যেমন: ওকে দিয়ে এ কাজ হবে না। (দিয়ে অনুসর্গ অব্যয়)। অনুসর্গ অব্যয় ‘পদান্বয়ী অব্যয়’ নামেও পরিচিত। অনুসর্গ অব্যয় দুই প্রকার। যেমন: বিভক্তিসূচক অনুসর্গ অব্যয় ও বিভক্তিসম অনুসর্গ অব্যয়।
অনুকার অব্যয়
যে সকল অব্যয় অব্যক্ত রব, শব্দ বা ধ্বনির অনুকরণে গঠিত হয় তাদের অনুকার বা ধ্বন্যাত্মক অব্যয় বলে। যেমন:
বজ্রের ধ্বনি: কড় কড়
মেঘের গর্জন: গুড় গুড়
বৃষ্টির তুমূল শব্দ ঝম ঝম
সিংহের গর্জন: গর গর
স্রোতের ধ্বনি: কল কল
ঘোড়ার ডাক: চিহি চিহি
বাতাসের গতি: শন শন
কাকের ডাক: কাকা
শুষ্ক পাতার শব্দ: মর মর
কোকিলের ডাক: কুহু কুহু
নুপূরের আওয়াজ: রুম ঝুম
চুড়ির শব্দ: টুং টাং
অনুভূতিমূলক অব্যয়ও অনুকার অব্যয়ের শ্রেণিভূক্ত। যেমন: ঝাঁ ঝাঁ (প্রখরতাবাচক), খাঁ খাঁ (শূন্যতাবাচক), কচ কচ, কট কট, টল মল, ঝল মল, চক চক, ছম ছম, টন টন, খট খট ইত্যাদি।
অব্যয় বিশেষণ: কতগুলো অব্যয় বাক্যে ব্যবহৃত হলে নামবিশেষণ, ক্রিয়াবিশেষণ ও বিশেষণীয় বিশেষণের অর্থবাচকতা প্রকাশ করে থাকে। এদের অব্যয় বিশেষণ বলা হয়। যেমন:
• নামবিশেষণ: অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ
• ভাব বিশেষণ: আবার যেতে হবে
• ক্রিয়াবিশেষণ: অন্যত্র চলে যায়
কতগুলো যুগ্মশব্দ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল সেগুলো নিত্য সম্বন্ধীয় অব্যয় রূপে পরিচিত। যেমন: যেমন, তথা, যত-তত, যখন-তখন, যেমন- তেমন, যেরূপ-সেরূপ ইত্যাদি। যথা ধর্ম তথা জয়। যত গর্জে তত বর্ষে না।
ত-প্রত্যয়ান্ত অব্যয় বাংলায় ব্যবহৃত হয়। যেমন ধর্মত বলছি। দুর্ভাগ্যবশত পরীক্ষায় ফেল করেছি। অন্তত তোমার যাওয়া উচিত। জ্ঞানত মিথ্যা বলিনি।
ক্রিয়া পদ
যে পদের দ্বারা কোনো কার্য সম্পাদন করা বোঝায় তাকে ক্রিয়াপদ বলে।
১. কবির বই পড়ছে।
২. তোমরা আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে।
‘পড়ছে’ ও ‘দেবে’ পদ দুটো দ্বারা কোনো কার্য সম্পাদন করা বোঝাচ্ছে বলে এরা ক্রিয়াপদ।
বাক্যের অন্তর্গত যে পদ দ্বারা কোনো পুরুষ কর্তৃক নির্দিষ্ট কালে কোনো কার্যের সংঘটন বোঝায় তাকে ক্রিয়াপদ বলে।
বিবিধ অর্থে ক্রিয়াপদকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন:
- ভাবপ্রকাশ ক্রিয়া: ভাব প্রকাশের দিক দিয়ে ক্রিয়াপদ ২ প্রকার। যেমন: সমাপিকা ক্রিয়া, অসমাপিকা ক্রিয়া
অন্যান্যভাবে ক্রিয়াপদ ৬ প্রকার। যেমন: অকর্মক, সকর্মক দ্বিকর্মক, প্রযোজক ক্রিয়া, যৌগিক ক্রিয়া, মিশ্র ক্রিয়া।
ক্রিয়ামূল বা ধাতুর সঙ্গে পুরুষ অনুযায়ী কালসূচক ক্রিয়াবিভক্তি যোগ করে ক্রিয়াপদ গঠন করতে হয়। যেমন: ‘পড়ছে’-পড় ‘ধাতু’+’ছে’ বিভক্তি।
ক্রিয়া: যে শব্দ দিয়ে কাজ বুঝায় তাকে ক্রিয়া বলে।
- অনুক্ত ক্রিয়া: যে বাক্যে ক্রিয়া উহ্য থাকে তাকে অনুক্ত ক্রিয়া বলে।
- সমাপিকা ক্রিয়া: যে ক্রিয়া বাক্যকে সমাপ্ত করে তাকে সমাপিকা ক্রিয়া বলে।
- অসমাপিকা ক্রিয়া: যে ক্রিয়া বাক্যকে সমাপ্ত করতে পারে না তাকে অসমাপিকা ক্রিয়া বলে।
- সকর্মক ক্রিয়া: যে ক্রিয়ার কর্মপদ থাকে তাকে সকর্মক ক্রিয়া বলে।
- অকর্মক ক্রিয়া: যে বাক্যে কোনো কর্মপদ থাকে না তাকে অকর্মক ক্রিয়া বলে।
- দ্বিকর্মক ক্রিয়া: যে ক্রিয়ার দুটি কর্ম থাকে তাকে দ্বিকর্মক ক্রিয়া বলে।
- সমধাতুজ কর্ম: যে বাক্যে ক্রিয়া ও কর্মপদ একই ধাতু থেকে তৈরি তাকে সমধাতুজ/ধাত্বর্থক কর্ম বলে।
- প্রযোজক ক্রিয়া: যে ক্রিয়া প্রযোজনা করে তাকে প্রযোজক ক্রিয়া বলে।
- নামধাতু: বিশেষ্য, বিশেষণ ও ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের পরে আ-প্রত্যয়যোগে গঠিত ধাতুকে নামধাতু বলে।
- যৌগিক ক্রিয়া: সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়া দিয়ে গঠিত বিশেষ বা সম্প্রসারিত অর্থ প্রকাশক ক্রিয়াকে যৌগিক ক্রিয়া বলে।
- মিশ্রক্রিয়া: বিশেষ্য, বিশেষণ ও ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের সঙ্গে কর, হ, দে, পা, যা, কাট, গা, ছাড়, ধর, মার ইত্যাদি ধাতু দিয়ে গঠিত ক্রিয়াকে মিশ্রক্রিয়া বলে।
ক্রিয়াপদ বাক্যগঠনের অপরিহার্য অঙ্গ। ক্রিয়াপদ ভিন্ন কোনো মনোভাবই সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা যায় না। তবে কখনো কখনো বাক্যে ক্রিয়াপদ উহ্য বা অনুক্ত থাকতে পারে। যেমন:
ইনি আমার ভাই = ইনি আমার ভাই (হন)।
আজ প্রচণ্ড গরম = আজ প্রচণ্ড গরম (অনুভূত হচ্ছে)
তোমার মা কেমন? তোমার মা কেমন (আছেন)?
বাক্যে সাধারণত ‘হু’ ও ‘আছ’ ধাতু গঠিত ক্রিয়াপদ উহ্য থাকে।
- সমাপিকা ক্রিয়া: যে ক্রিয়াপদ দ্বারা বাক্যের (মনোভাবের) পরিসমাপ্তি জ্ঞাপিত হয় তাকে সমাপিকা ক্রিয়া বলে। যেমন: ছেলেরা খেলা করছে। এ বছর বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

0 Comments