কাজী নজরুল (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং অবিভক্ত বাংলার সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। নজরুল ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৪ মে ১৮৯৯) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন মসজিদের ইমাম ও মাযারের খাদেম। নজরুলের ডাক নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। ১৯০৮ সালে পিতার মৃত্যু হলে নজরুল পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য হাজী পালোয়ানের মাযারের সেবক এবং মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। তিনি গ্রামের মকতব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। শৈশবের এ শিক্ষা ও শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে নজরুল অল্পবয়সেই ইসলাম ধর্মের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠান, যেমন পবিত্র কুরআন পাঠ, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি বিষয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। পরবর্তী জীবনে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে ইসলামি ঐতিহ্যের রূপায়ণে ওই অভিজ্ঞতা সহায়ক হয়েছিল।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের জগতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত। রবীন্দ্রনাথের অনুকরণমুক্ত কবিতা রচনায় তাঁর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী কবিতার জন্যই ‘ত্রিশোত্তর আধুনিক কবিতা’র সৃষ্টি সহজতর হয়েছিল বলে মনে করা হয়। নজরুল সাহিত্যকর্ম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকা-ের মাধ্যমে অবিভক্ত বাংলায় পরাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, মৌলবাদ এবং দেশি-বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এ কারণে ইংরেজ সরকার তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ ও পত্রিকা নিষিদ্ধ করে এবং তাঁকে কারাদ-ে দ-িত করে। নজরুলও আদালতে লিখিত রাজবন্দীর জবানবন্দী দিয়ে এবং প্রায় চল্লিশ দিন একটানা অনশন করে ইংরেজ সরকারের জেল-জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এবং এর সমর্থনে নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে গ্রন্থ উৎসর্গ করে শ্রদ্ধা জানান।
ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয়। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কবির অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তনে কবিকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে নজরুলকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করে। ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পার্শ্বে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে
বিদ্রোহী কবি ও বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্য, সঙ্গীত ও সাংবাদিকতায় এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য কবিতা, কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক এবং গজল ও ইসলামী সঙ্গীত।তাঁর বিখ্যাত সাহিত্যকর্মগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- অগ্নিবীণা (১৯২২): তাঁর প্রথম ও অন্যতম জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ, যেখানে "বিদ্রোহী", "প্রলয়োল্লাস" প্রভৃতি বিখ্যাত কবিতা রয়েছে।
- দোলনচাঁপা (১৯২৩): প্রেম ও বিরহের অপূর্ব সংমিশ্রণ।
- বিষের বাঁশি (১৯২৪): তারুণ্যের জাগরণ ও ব্রিটিশবিরোধী চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
- সাম্যবাদী (১৯২৬): মানবতা ও সাম্যের জয়গান।
- অন্যান্য কাব্য: ঝিঙেফুল, সর্বহারা (১৯২৬), ফণি-মনসা, ছায়ানট (১৯২৫), চক্রবাক, ইত্যাদি।
- বাঁধন হারা (১৯২৭): নজরুলের প্রথম প্রকাশিত পত্রোপন্যাস।
- মৃত্যুক্ষুধা (১৯৩০): মানবজীবনের বাস্তব সংগ্রাম ও দারিদ্র্যভিত্তিক উপন্যাস।
- কুহেলিকা (১৯৩১): রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস।
- গল্পগ্রন্থ: ব্যথার দান (১৯২২), রিক্তের বেদন (১৯২৫), শিউলিমালা।
- প্রবন্ধগ্রন্থ: যুগবাণী (১৯২২), রুদ্রমঙ্গল, ধূমকেতু।
- নজরুল গীতি: প্রায় ৪,০০০ গানের স্রষ্টা। নজরুলের লেখা কালজয়ী গানের সংকলনের মধ্যে রয়েছে বুলবুল (১৯২৮), চোখের চাতক (১৯২৯), চন্দ্রবিন্দু (১৯৪৬) এবং সুরসাকী (১৯৩১)। তিনি বাংলা গজল ও ইসলামী গানের ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখেন।
- আলেয়া, ঝিলিমিলি, মধুমালা।

0 Comments